জ্বালানি সংকটে রপ্তানি খাতে বড় ধা'ক্কা, ৬৩ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য চ্যালেঞ্জে
জ্বালানি সংকটে রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা, ৬৩ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য চ্যালেঞ্জে
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় যুগের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব শেষে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে বিএনপি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানিকে গতিশীল করা। সেই পরীক্ষায় দেশের রপ্তানি খাতের চিত্রে যেমন ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস মিলেছে, তেমনি জ্বালানি সংকটে প্রবৃদ্ধির দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। খাত-
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সংকটে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ৬৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট ৬,৩৪০ কোটি (৬৩.৪ বিলিয়ন) ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫,৫২০ কোটি এবং সেবা খাত থেকে ৮২০ কোটি ডলার আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সম্প্রতি এ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্জিত রপ্তানি আয়ের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশি ও বৈশ্বিক সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ৬৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ উচ্চাভিলাষী।
বিজ্ঞাপন নতুন লক্ষ্যমাত্রায় পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় অবদান থাকবে তৈরি পোশাক খাতের। এ খাত থেকে ৪,৪৫০ কোটি ডলার আয়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩,৮৭০ কোটি ডলার। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পণ্য রপ্তানি থেকে ৫,৫০০ কোটি এবং সেবা খাত থেকে ৮৫০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬,৩৫০ কোটি (৬৩.৫ বিলিয়ন) ডলার। তবে বছর শেষে নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রকৃত রপ্তানি আয় কম হওয়ায় তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। দেশে ইতোমধ্যে গ্যাসের সংকট নতুন করে আবার তীব্র হয়েছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে চাহিদা কমায় পণ্যের মূল্য বাড়ছে না। এ অবস্থার মধ্যে সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি খাত স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থায় পৌঁছায়নি। বরং মাসভেদে ক্রয়াদেশ, বৈশ্বিক চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা ও শিপমেন্টের ওপর নির্ভর করেই রপ্তানি আয় ওঠানামা করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-জুলাই ছয় মাসে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ২৪.০৮ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ২০২৬ সালের একই সময় আয় হয়েছে ২৪.৩০ বিলিয়ন ডলার। ফলে ছয় মাস শেষে প্রবৃদ্ধি খুবই সামান্য—প্রায় ০.৯ শতাংশ। অথচ এ সময়ের মধ্যে দুই দফা বড় পতন এবং দুই দফা শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয় ৩.৪৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৩.৯৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কম। দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ায় মাসটিতে বড় ধাক্কা খায় রপ্তানি। ফেব্রুয়ারিতে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক ১৩ শতাংশের বেশি কমার চিত্র উঠে আসে। মার্চে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। ওই মাসে রপ্তানি আয় নেমে আসে ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের মার্চে আয় হয়েছিল প্রায় ৪.২৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। রমজান, দীর্ঘ ঈদের ছুটি এবং উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এ সময়ে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি করে। এরপর এপ্রিলে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা ঘটে। রপ্তানি আয় ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের একই মাসের প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩২.৯২ শতাংশ বেশি। মার্চের ছুটিজনিত উৎপাদন ও শিপমেন্টের ব্যাকলগ এপ্রিলে পাঠানো এবং তৈরি পোশাকের চালান বাড়ার কারণে এ প্রবৃদ্ধি আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা মে মাসে ধরে রাখা যায়নি। ওই মাসে রপ্তানি আয় হয় ৪.৪০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৪.৭৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৭.০৭ শতাংশ কম। ঈদের দীর্ঘ ছুটি ও বৈশ্বিক চাহিদার মন্থরতা এ পতনের অন্যতম কারণ ছিল। জুনে আবার রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। মাসটিতে আয় হয়েছে ৪.২০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ২৫.৯১ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর শক্তিশালী পারফরম্যান্সে মাসটি অর্থবছরের শেষদিকে রপ্তানিতে স্বস্তি আনে। কৃষিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, এগিয়েছে তিন বড় উদ্যোগকৃষিতে-১৮০-দিনের-
কর্মপরিকল্পনা,-এগিয়েছে-তিন-বড়-উদ্যোগ নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় আরো বেড়ে ৪.৭২ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। জুনের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয় ১২.৪৯ শতাংশ। তবে আগের বছরের জুলাইয়ের ৪.৭৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় আয় ০.৯ শতাংশ কম। তৈরি পোশাক রপ্তানিও এ মাসে ১.৯২ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, কোনো সরকারকে মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তারপরও ব্যবসা পরিচালনাকে সহজতর করে বেসরকারি খাতকে সহায়তা করার জন্য এবং অর্থনীতির গতিধারা ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, আংশিক রপ্তানিমুখী এবং বন্ড সুবিধাবিহীন রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। এটি আমাদের রপ্তানিকারকদের জন্য অনেক সহায়ক হবে এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করবে। করনীতিতেও ভালো কিছু পরিবর্তন এনে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ মুহূর্তে শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি। এ সময়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আশা করি তারা দীর্ঘমেয়াদে এসব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে। সামগ্রিক চিত্র বলছে, রপ্তানি খাত এখনো স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থায় পৌঁছায়নি।
বরং মাসভেদে ক্রয়াদেশ, বৈশ্বিক চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা ও শিপমেন্টের ওপর নির্ভর করেই রপ্তানি আয় ওঠানামা করছে। গত অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ০.৫৮ শতাংশ কম ছিল।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স